Skip to content
July 25, 2026 — Independent Digital News
Biz News
BREAKING 3 hours ago
World

অপূর্ণতার পূর্ণতা

আষাঢ় মাস এলেই আমার মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করে। নিজেই নিজের প্রশংসা করে শেষ করতে পারি না। আষাঢ় মানেই আমার কাছে পূর্ণতার মাস।

আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য অভয়পুরের রাজবাড়িতে যেতে হয়। এখানে সচরাচর কেউ যায় না। সেদিন আমিসহ আমার দলের তিনজন সদস্য যাই। রাজবাড়িটি খুব পুরোনো। তাই এর বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বিধায় আমরা এটিকেই আমাদের বিষয় হিসেবে বেছে নিই। বাড়িটির গেট দিয়ে ঢুকতেই আচমকা এক ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগে আমার গায়ে। তবে বিষয়টি অত গুরুত্বপূর্ণ মনে না করে আমরা বাড়ির ভেতরে যেতে থাকি। বাইরে যেমন লতা-পাতায় ভরে গেছে বাড়ি, তেমনি ভেতরেও ধুলাবালি। আমরা সময় নষ্ট না করে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন তথ্য লিখতে থাকি। কিছু সময় পর আমার চোখ পড়ে একটি ছবির দিকে। ধুলামাখা অবস্থায় একটি টেবিলে ছবিটি পড়ে ছিল। কৌতূহলবশত হাত দিয়ে ধুলা সরাতেই দেখলাম এক অপরূপ সুদর্শন যুবক, যার পরনে একটি পাঞ্জাবি এবং এক কাঁধে শাল। তার চোখ ছিল মায়াবী। পুরুষ মানুষও এত সুন্দর হতে পারে আগে ভাবতেও পারিনি। ছবির নিচের সালটা লক্ষ করলাম। ১৮৮০-১৯০৫।

আজকের মতো কিছু তথ্য নিয়ে সবাই বাড়ি ফিরে গেলাম। আমার চোখের সামনে শুধু সেই ছবিটি ভাসতে থাকে। রাতে আমার ঘুমই হলো না। মন বোধ হয় পড়ে আছে সেই বাড়িতেই। সকালে সবাইকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বললাম। কিন্তু সবাই মানা করে দিয়ে বলল পরশু আসবে। হাতে এখনো সময় আছে। তবে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। চলে গেলাম নিজেই। গিয়েই ছবিটি দেখার উত্তেজনা সামলাতে না পেরে চলে গেলাম ওপরের ঘরে। কিন্তু গিয়েই আমার শরীর থমকে গেল। ছবিটি গতকাল আমি টেবিলে রেখে গিয়েছিলাম, কিন্তু এখন নেই। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। জানালার পাশে তাকাতেই দেখি আকাশে মেঘ। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। আজ আসা আমার ভুল হয়েছে ভেবে জানালার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। ঝোড়ো হাওয়া, সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানো। হঠাৎ এক শীতল হাওয়া গায়ে লাগল, ঠিক গতকালের মতো। সঙ্গে লাইটও ছিল না। অন্ধকার পুরোনো রাজবাড়ি। ভয়টা এখন গভীর হতে লাগল। পেছনে কারও উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম। আমার শ্বাস দ্রুত হতে লাগল। হঠাৎ আমার কাঁধে এক অদ্ভুত স্পর্শ পেলাম। আর চোখের সামনে হাজির ছবির যুবকটি। আমার চিৎকারে পুরো রাজবাড়ি কেঁপে উঠল। তবে যুবকটি তখনো দাঁড়িয়ে। সেই পাঞ্জাবি, সেই কাঁধে শাল। আমি কিছুক্ষণ নির্বাক ছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার শরীরে প্রাণ নেই। তবে পরক্ষণেই দেখি সে সোজা জানালার কাছে গিয়ে বৃষ্টি দেখা শুরু করেছে। একটু ভয় নিয়ে কাছে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

‘বৃষ্টি পছন্দ করো?’

—আগে করতাম। তবে জানতাম না এই বৃষ্টি, ঝড় আমার জীবনে সারা জীবনের জন্য নেমে আসবে। আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে আমার পছন্দের মানুষ।

অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পরক্ষণেই সে বলতে লাগল তার ভালোবাসার গল্প। তার ভালোবাসা যে হারিয়ে গেছে বজ্রপাতে। যার অভাবে সে নিজের প্রাণ নিয়েছে।

সে এখন কোনো মানুষ নয়। যন্ত্রণায় কাতরানো এক অভিশপ্ত আত্মা, যে নিজের প্রাণ নিয়েও এখনো মুক্তি পায়নি। ভুগছে অপূর্ণতার কষ্টে।

তবে আমার একটুও ভয় লাগছিল না। কষ্ট পাচ্ছিলাম তার অপূর্ণতার গল্পে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে যখন চোখ খুললাম, তখন তাকে আর দেখতে পাইনি। ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমি বাড়ি গিয়ে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না। পরের দিন আমি আবার গেলাম। তবে আমি একা না। আমার সঙ্গে আছে এক পূর্ণতার গল্প—সেই গল্প, যা হতে পারত বাস্তব।

ঠিক যে জায়গায় কাল সে তার অপূর্ণতার গল্প বলছিল, আমি ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাতভর আমার লেখা তার পূর্ণতার গল্প পড়তে লাগলাম। পরক্ষণেই সে আবার দেখা দিল আমাকে। আমি তার চোখে দেখলাম অশ্রু। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘তোমার অনুমতি ছাড়া তোমার প্রিয়া আর তোমার প্রেমের পূর্ণতা দিয়েছি। তুমি কি রাগ করেছ?’

সে হেসে উঠল,

‘জানি না বাস্তবে আমাদের পূর্ণতা এত সহজ হতো কি না। তবে বাস্তবে পূর্ণতা না পেয়েও যে গল্পে পূর্ণতা পেয়েছি, এতেই আমার শান্তি। হয়তো আমি কখনোই আমার প্রিয়ার সঙ্গে থাকতে পারব না। তবে তোমার গল্পের পূর্ণতায় আমি আজীবন থাকব তাঁর সঙ্গে।’

কাছে এগিয়ে এসে পৃষ্ঠাটি নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে। নিজের মনেও অদ্ভুত শান্তি পেলাম। এরপর সে হাওয়ায় মিশে গেল।

এখনো সময় পেলে যাওয়া হয় সেখানে। তবে তাকে আর দেখতে পাই না। শুধু তার সেই সুদর্শন ছবি।

বাস্তবতা কঠিন। তবে গল্পে আষাঢ় কল্পনার পূর্ণতায় পরিপূর্ণ।

লেখক: তামিম নূরানী প্রেমা, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়