Skip to content
July 25, 2026 — Independent Digital News
Biz News
BREAKING 3 hours ago
Blog

আজও কেন ফুরায় না উত্তম–জাদু

বছরের পর বছর, বাংলা সিনেমার দুনিয়ায় নায়ক অনেকেই হয়েছেন, সুপারস্টারও এসেছেন অনেক। কিন্তু ‘মহানায়ক’ উপাধিটি আজও যেন একাই বহন করেন উত্তমকুমার। কারণ, তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু বক্স অফিসে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল বাঙালির জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতিতে। মৃত্যুর চার দশকের বেশি সময় পরও তাঁর সিনেমা নতুন দর্শক আবিষ্কার করে, অভিনয় নিয়ে গবেষণা হয়, আর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই দুই বাংলায় ফিরে আসে তাঁকে ঘিরে আবেগ।

গতকাল ২৪ জুলাই মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভক্ত, শিল্পী ও সংস্কৃতিজনেরা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করেছে স্মরণসভা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা। শুক্রবার সারা দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনভর চলেছে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু উত্তমকুমারের জাদু আজও ফুরায়নি।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় জন্ম তাঁর। জন্মনাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। সংসারের টানাপোড়েনের কারণে কলেজজীবন শেষ করতে পারেননি। জীবিকার জন্য যোগ দেন পোর্ট কমিশনার্স অফিসে সাধারণ কেরানির চাকরিতে। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি অভিনয়ের স্বপ্নকে কখনো বিসর্জন দেননি। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার ও যাত্রার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। স্কুলের নাটক থেকে শুরু করে থিয়েটারের মহড়া—সবখানেই ছিল তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। সেই ভালোবাসাই একদিন তাঁকে নিয়ে যায় রুপালি পর্দায়।

চিরকালের মহানায়ক উত্তমকুমার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে
চিরকালের মহানায়ক উত্তমকুমার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

১৯৪৭ সালে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান ‘মায়াডোর’ ছবিতে। কিন্তু ছবিটি মুক্তিই পায়নি। এরপর ‘দৃষ্টিদান’, ‘কামনা, ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’ ও ‘কার পাপে’—একের পর এক ছবি ব্যর্থ হয়। বারবার ব্যর্থতার কারণে স্টুডিওপাড়ায় তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা হতো। কেউ কেউ ডাকত ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই তরুণের অভিনয়জীবন হয়তো আর এগোবে না। কিন্তু তিনি থামেননি। প্রতিটি ব্যর্থতা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

এই কঠিন সময়েই তাঁর ওপর আস্থা রাখেন অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল। নির্মাতা নির্মল দে নতুন ছবি ‘বসু পরিবার’-এর নায়ক খুঁজছিলেন। তখন পাহাড়ী সান্যালই উত্তমকুমারের নাম প্রস্তাব করেন। নির্মাতা প্রথমে আপত্তি জানালেও পাহাড়ী সান্যাল তাঁকে আশ্বস্ত করেন। শুধু তা-ই নয়, অরুণ কুমারের বদলে ‘উত্তম’ নামটি ব্যবহারের পরামর্শও দেন।

সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় বাংলা সিনেমার ইতিহাস। ‘বসু পরিবার’ সফল হয়, আর ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে। জন্ম নেয় বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি। নায়ক উত্তমকুমার হয়ে ওঠেন মহানায়ক উত্তমকুমার।
এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তিন দশকের অভিনয় জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন প্রায় ২০০টির বেশি চলচ্চিত্রে। অভিনেতার পাশাপাশি ছিলেন পরিচালক, প্রযোজক ও সুরকার। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ২৯টি এবং সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে সর্বাধিক ৩২টি ছবিতে অভিনয় করেন। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘গৃহদাহ’, ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও বাংলা সিনেমার মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

উত্তমকুমার
উত্তমকুমার

তাঁর অভিনয়ের শক্তি ছিল স্বাভাবিকতায়। সংলাপ বলার ধরন, চোখের ভাষা, হাসি, নীরবতা—সবকিছুই ছিল এতটাই সহজ যে দর্শক চরিত্রটিকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করতেন। এ কারণেই তিনি শুধু তাঁর সময়ের দর্শকের নন, আজকের প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, তাঁর মতো তারকা আর হবে না। সুচিত্রা সেনের মতে, তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী, যদিও তাঁর প্রতিভার পুরোটা ব্যবহার করা হয়নি। আর নিজের অভিনয়দর্শন সম্পর্কে উত্তমকুমার বলেছিলেন, তিনি কখনো সাজানো বা কৃত্রিম অভিনয়ে বিশ্বাস করতেন না; মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকেই চরিত্রকে তুলে ধরতে চাইতেন।

তাই আজও তাঁর জাদু ফুরায় না। কারণ, তিনি শুধু একজন সফল নায়ক নন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর সিনেমা এখনো টেলিভিশনে প্রচারিত হয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নতুন দর্শক খুঁজে পায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সংলাপ ও দৃশ্য নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুবার্ষিকী এলেই তাঁকে ঘিরে আলোচনা প্রমাণ করে উত্তমকুমার কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নায়ক নন; তিনি বাংলা সিনেমার এক চিরন্তন উত্তরাধিকার।

উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনসংগৃহীত

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন উত্তমকুমার। কিন্তু তাঁর প্রস্থান তাঁকে মানুষের মন থেকে মুছে দিতে পারেনি। কেওড়াতলায় দিনব্যাপী শ্রদ্ধাঞ্জলি, দুই বাংলার মানুষের ভালোবাসা আর নতুন প্রজন্মের আগ্রহ যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—মহানায়ক উত্তমকুমারের কোনো সমাপ্তি নেই। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি আর কোটি দর্শকের হৃদয়ে।